কাঠফাটা রোদে যখন অতিষ্ঠ নগরজীবন, গলা ভিজিয়ে নিতে তখন চাই শীতল পানীয়। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা- বছরজুড়ে রাজধানীবাসীর সেই তৃপ্তিদায়ক পানীয়ের চাহিদা পূরণ করছে বিউটি লাচ্ছি। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি সগৌরবে শত বছরে পা রেখেছে।
পুরান ঢাকার জনসন রোড ধরে সদরঘাটের দিকে যেতেই সড়কের পশ্চিম পাশে চোখে পড়বে বিউটি লাচ্ছি ও ফালুদার দোকান। শত বছরের সুনাম নিয়ে, মানুষের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে এখানকার লাচ্ছি, ফালুদা বা লেবুর শরবত।
পুরান ঢাকার বাহারী সব খাবারের যোগসূত্র মোগল আমল থেকেই। বিভিন্ন শাসকরা যখন এ দেশে এসেছিলেন তখন নিয়ে এসেছিলেন এসব রেসিপি। ধারণা করা হয় পানীয় হিসেবে লাচ্ছি সেভাবেই এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। লাচ্ছি দই থেকে প্রস্তুতকৃত এক ধরনের সুস্বাদু পানীয়। দইয়ের সঙ্গে চিনি, বিট লবণ ও নানা ধরনের মসলা যোগ করে ব্লেন্ড করে লাচ্ছি তৈরি করা হয়।
এদিকে ফালুদার সঙ্গে পারস্যের গল্প জড়িয়ে আছে। সে দেশে ফালুদেহ নামে একটি ডেজার্ট জনপ্রিয়। ভারতে আগত মুসলিম বণিক, শাসকদের হাত ধরে ভারতবর্ষে এর আগমন। ফালুদার উৎপত্তি মূলত দক্ষিণ এশিয়ায়। ঐতিহ্যগতভাবে এতে গোলাপ জল, সেমাই বা নুডলস, মিষ্টি বেসিল বীজ, জেলির টুকরো, দুধের মিশ্রণ থাকে। সবার উপরে থাকে আইসক্রিম। সে যাই হোক, এই সুস্বাদু খাবার সবাই তৈরি করতে পারেন না। অথচ কত সহজেই না বিউটি লাচ্ছি এই গুণ আয়ত্বে এনেছেন।
১৯২২ সালের ১৫ জুন পুরান ঢাকার ফুটপাথে লেবুর শরবত ও লাচ্ছি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন আব্দুল আজিজ। প্রায় চার পুরুষের এই ব্যবসা এখনও চলমান। আব্দুল আজিজের পর আব্দুল গাফফার মিয়ার পরিচালনাকালে ব্যাপক সুনাম অর্জন করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর গাফফার মিয়ার দুই সন্তান মানিক হোসেন ও জাবেদ হোসেন দেখাশোনা করছেন প্রতিষ্ঠানটির। জাবেদ হোসেনের ছেলে জাহিদ হোসেনও যুক্ত হয়েছেন পারিবারিক ব্যবসায়। বিউটি লাচ্ছি ও ফালুদার মোট তিনটি শাখা রয়েছে। জনসন রোডের দোকানটির দায়িত্বে আছেন জাবেদ হোসেন। নাজিরাবাজার শাখা সামলান মানিক হোসেন এবং লক্ষীবাজার শাখার দেখাশোনা করেন জাহিদ হোসেন।
লাচ্ছি, ফালুদার পাশাপাশি লেবু পানিও এখানে পাওয়া যায়। লাচ্ছির দাম ৪০ টাকা, ফালুদা নরমাল ৮০ টাকা, স্পেশাল ১০০ টাকা। এ ছাড়া লেবুর শরবত পাওয়া যায় ২০ টাকা গ্লাস। রোজ সকাল নয়টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চলে বিক্রি। সব সময় ভিড় লেগেই থাকে। গরম বাড়লে দোকানে বাড়ে বেচাকেনার ধুম। দোকানের সামনের অংশে বানানো হয় লাচ্ছি। পেছনের অংশে ফালুদা। প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার টাকার লাচ্ছি ও ফালুদা বিক্রি করা হয় বলে জানান দোকান কর্তৃপক্ষ।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় জাবেদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের কারও নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয়নি। মানুষ যখন লাচ্ছি খেতে আসতো তখন বলতো- এই লাচ্ছিটা বিউটি! গুণগত মান, ভালো ও সুস্বাদু হওয়ায় লোকমুখে ‘বিউটি লাচ্ছি’ নামটা ছড়িয়ে পড়ে। ‘বিউটি’ নামটি আসলে শরবতের স্বাদ জানান দেওয়ার জন্যই বলা। আর সেখান থেকেই নাম।’
‘আমাদের ব্যবহৃত উপকরণ ফ্রেশ ও ভেজালমুক্ত। শরীরের জন্য ক্ষতিকারক কোনো পদার্থ বা ভেজাল না মেশানোয় স্বাদে অনন্য।’ বলেন জাবেদ হোসেন। লাচ্ছি খেতে আসা সুমন জানান, অন্য সব জায়গার চেয়ে বিউটি লাচ্ছির স্বাদ আলাদা।
এই লাচ্ছির স্বাদ নিতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে পুরান ঢাকায়। ঢাকার যে কোনো জায়গা থেকে সদরঘাটগামী বাসে উঠলে রায়সাহেব মোড়ে নামলেই দেখা মিলবে এই দোকানের।
সূত্রঃ রাইজিংবিডি

