অভাবের গল্প -১ নেকবর খান

Posted on

ছয় মেয়ে আর সারী জয়নবকে নিয়ে রমজান আলীর সংসার। সামান্য ভিটে বাড়ী ছাড়া সামনে পিছনে আর কিছুই নাই তার। 

অভাব কাকে বলে হারে হারে টের পায় রমজান,কিন্তু ধৈর্যআর মনো বলের কমতি নেই এই দম্পতির। সামান্য মূলধন আর কঠোর পরিশ্রম ও শক্ত মনোবলকে পুজি করে চলে আট জনের ভরণ পোষন। ভরণ পোষন বলেতে শাক শুটকি আলুভর্তা আর মোটা কাপড়। 

মাঝে মাঝে উপোষ তবুও মনোবল জানায়নি এই দম্পতি। রমজান কখন ও যায়নি অন্যের জমিতে মজুরী খাটতে। জয়নব ও ঝি এর কাজ করতে যায়নি অন্যের বাড়ীতে। মাত্র ছয়মন ধারেন মূলধনে বছরের পর বছর চলে তাদের সংসার। রমজান সপ্তাহে একদিন বাজার থেকে ছয়মন ধান কিনে আনে আর জয়নব তা সিদ্ধকরে রোদে শুকিয়ে নিজ হাতে  তৈরী করে চাউল।

 একসর দুইসের করে চাউল কিনে নেয় খুচরা ক্রেতারা। এতে যা লাভ হয় তা দিয়ে অর্ধাহারে অনাহরে চলে আট জনের সংসার। ধান সিদ্ধথেকে শুরু করে চাল তৈরী পর্যন্ত জয়নবকে সহযোগিতা করে তার মেয়েরা।অসুখ হলে ঔষধ কেনার ক্ষমতা নেই। 

সংসারে কারো অসুখ হলে অন্যেরা বলে আল্লাহ অসুখ দিয়েছে  আল্লাহই ভাল করবেন। গরীবের সংসারে যতটুকু রহমত দেওয়ার তা রমজানের সংসারে  দিতে কার্পন্য করেননি মহান আল্লাহ তায়ালা। 

অভাব অনটন আর অসুখ বিসুখে মারা যায়নি পরিবারের একজন সদস্যও।সংসারে যোগ হল শাহীন,তুষহীন নামে আরও দুটি নতুন মূখ। ভার বেরে গেলেও আনন্দের বন্যা বয়তে শুরু রমজানের সংসারে। ছয় মেয়ের পর দুটি পুত্র সন্তান এ যেন আল্লাহর নিজ হস্তের দান।

 কঠোর থেকে কঠোরতর  পরিশ্রমি হয়ে উঠল রমজানের পরিবার। এবার শুধু ধানভানা আর চাল বিক্রীতে সীমাবদ্ধ নয় রমজান দম্পতি। জাল দিয়ে মাছ ধরে রমজান আর হাস মুরগী পালন শুরুকরে জয়নব। 

এতে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণও বাজারে মাছ, ডিম বিক্রী করে নগদ পয়সার মূখ দেখতে শুরু করে রমজান।

চলবে।

(পূর্ব প্রকাশের পর)

           ————————

বছর বছর অল্প অল্প জমিও কিনতে শুরু করেন।ইতি মধ্যে চার মেয়ের বিয়েও হয়ে যায় বেশ স্বচ্ছল জামাইদের সাথে। রমজান জয়নবের হাড় ভাঙ্গা খাটুনিতে যেন উন্নয়নের হাওয়া লেগেছে এই সংসারে।

অভাব পুরোপুরি দূর হয়েছে বলা যায়নি, তবে এখন আর অনাহারে থাকতে হয়না তাদের। শাহীন, তুহীনের নাদুশ,নুদুশ স্বাস্হ্যই বলে দেয়,রমজান আর আগের মত হত দরিদ্র নয়।স্কুলেও ভর্তি করা হয়েছে, শাহীন আর তুহীনকে।

রমজানের দুই ছেলে স্কুলে যাবে,লেখা পড়া শিখবে,তা যেন সমাজের কারো কারো গাঁ জ্বালার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। ধনী গরীবের ছেলে,মেয়ে একই স্কুলে পড়বে? সরকারের এই আইন যেন তাদের কাছে বে আইনি বলে মনে হতে লাগছে। রাগে ক্ষোভে সরকারী প্রাইমারি স্কুলে না পড়ানোর সিদ্ধান্ত ও নিয়েছে হিংসুটে ধনী শ্রেণীর কেও কেও। 

মান সম্মান রক্ষার্থে তাদের ছেলে মেয়েকে হয়তো দূরে  কোনো স্কুলে অথবা কিণ্ডার গার্টেনে ভর্তির চেষ্টাও করেছে, অথবা আর পড়াবেন না বলেও কেউ কেউ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হিংসুটে ধনীদের এই সিদ্ধান্ত ভুল না সঠিক তা এখন বুজা যাচ্ছেনা। তাদের সন্তানেরা হয় বড় বড় সরকারী কর্মকর্তা হবে না হয় আস্তাকুড়ে পরে থাকবে। তবে রমজানের মত দরিদ্রদের ছেলে মেয়েরা সরকারী  সুযোগ সুবিধা ভোগকরে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে এটা সুন্চিত। 

প্রাইমারি পেরিয়ে উচ্চবিদ্যালয়ে উঠেছে শাহীন,তুহীন। তুহীন বরাবরই প্রথম হয়ে এক শ্রেণী থেকে আরেক শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। শাহীনও ফেল করেনি কোন পরীক্ষাতেই।  

তবে দুই ছেলের বই খাতা কেনা আর স্কুলের মাসিক বেতন যোগাতে বিছুটি হুচট খেতে হয় রমজানকে। তাই সিদ্ধান্ত হয় শাহীন লেখাপড়া ছেড়ে বাবাকে  সাহায্য করবে সংসারের কাজে। আর তুহীন চালিয়ে যাবে পড়ালেখা।

 তুহীনের মেধা,সাহসীকতা আর দূরন্তপনা দেখে আরেক দফা গাঁ জ্বালা শুরু হয়ে যায় হিংসুটেদের। জুনিয়র স্কুলে অষ্টম শ্রেণীর ফলা ফলেও প্রথম স্হানদখল করে তুহীন। মেধাবী ছাত্র হিসাবে প্রতি বছরই বিভিন্ন উপহার পেয়ে থাকে তুহীন। তবে সবচেয়ে দামী এবং রায়হান সাহেবের ছেলে মাসুদরায়হানের আদলে জামা কাপড় আর জুতু জোড়া উপহার দিয়ে থাকে,রায়হান সাহেবের ছোট মেয়ে রুমানারায়হান। 

অবশ্য তা দেয়া এবং নেয়া হয় অতি গোপনে।রুমানা তার মায়েরকাছে বায়না ধরে থাকে মাসুদ রায়হানের জন্য যে জামা,জুতা কেনা হয় ঠিক সে রকম জামা, জুতাতাকেও দিতে হবে। আদরের মেয়ের আবদার না করতে পারেনা বেগম রায়হান। তাই প্রতি বছরই রুমানা রায়হানের পক্ষথেকে তুহীন পেয়ে থাকে মাসুদরায়হানের আদলের জামা জুতা।

ঐ দিকে স্কুল কর্তৃপক্ষ আয়োজন করেন এক বিতর্ক প্রতিযোগিতা। বিতর্কের বিষয় বস্তু ‘ধনের চেয়ে জ্ঞান বড়।’

বিষয় কস্তুর পক্ষের দলনেতা, তুহীন আর বিপক্ষের দলনেতা কিণ্ডার গার্টেন  স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র রায়হান সাহেবের ছেলে মাসুদ রায়হান। উক্ত অনুষ্টানে প্রধান অথিতি বিশিষ্ট সমাজ সেবক জনাব রায়হান সাহেব।

তুহীনের ক্ষুরধার বক্তব্যের কাছে শোচনীয় পরাজয় বরন করে মাসুদ রায়হানের দল। তুহীনের বক্তব্যের সময় দর্শক স্রোতার পক্ষথেকে শুনা যায়, ধন্য ধন্য শব্দ আর মাসুদ রায়হানের বক্তব্যের সময় শুনা যায় ফিস ফিস আওয়াজ।

মাথা নীচু হয়ে যায় রায়হান সাহেবের। প্রতিশোধের ক্ষোভ সৃষ্টি তার অন্তরে।

(পূর্ব প্রকাশের পর)

              “””””””””””””””””””””””””””””

কী দোষ তুহীনের? কী অন্যায় সে করেছে? হ্যা দোষ তার আছে, সে হত দরিদ্র রমজানের ছেলে। এর চেয়ে বড় দোষের কোন প্রয়োজন নেই। 

বিতর্কে রমজানের ছেলের সাথে তার ছেলের পরাজয়, তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না,রায়হান সাহেব।

কোন একটা অভিযোগ দিয়ে তুহীন কে দমন করতে হবে,নয়লে  একদিন সমাজে মাথা উচুঁ করে দাড়িয়ে যেতে পারে।

 ফন্দি আটতে শুরু করেন,রায়হান সাহেব। তিনি চা দোকান সহ বিভিন্ন জায়গায় বলতে শুরু করেন,রমজান তো এই গ্রামেরই মানুষ,আপনারা তো জানেন, তার কী আছে? আর তুহীনের জামা,জুতা দেখে কী আপনারা মনে করেন তার বাবার টাকায় এসব কিনতে পারে?

রায়হান সাহেবের কথায় যেন সমাজের মানুষের মনে প্রশ্ন উকি দিতে থাকে। রমজানের ছেলে এত দামী জামা,জুতা পায় কোথায়? রমজান কি পারবে এত দামী জামা,জুতা কিনে দিতে?

 আসলে রায়হান সাহেব একজন মানী লোক। 

তা না হলে এই ব্যাপারটা অন্য কেউ বুঝল না কেন? গুন্জন শুরু হয় তুহীনের জামা,জুতা নিয়ে। এমন কী রমজানের মনেও প্রশ্ন জাগে।

প্রতিশোধ নেয়ার হাতিয়ার হিসাবে রায়হান সাহেব ব্যাবহার  করলেন,তুহীনের এই দামী জামা,জুতাকেই।

কিছুদিন পরই তুহীনের বিরুদ্ধে সাজানো হয় এক চুরির ঘঠনা।

  রায়হান যখন বলে উঠলেন,দেখছেন মিয়ারা, বলছিলাম যে,এত দামী জামা,জুতা তুহীন পায় কোথায়? আজ বুজতে পরছেন তো বেটা একটা পাক্কা চোর? উপস্হিতসবাই রায়হান সাহেবের কথায় সায় দিয়ে, চড়,থাপ্পর থেকে শুরু করে, তুহীনকে জুতাপেটা করতেও বাকী রাখেনি।

চোখের জল ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলনা রমজানের। কারন তুহীন তো কোনদিন তার মা,বাবা আর বন্ধু,বান্ধবের কাছে বলেনি যে প্রতি বছর একবার করে এই দামী জামা,জুতা উপহার হিসাবে দিয়ে থাকে, রায়হান সাহেবের মেয়ে রুমানা রায়হান।

রুমানা অবশ্য তার বাবাকে বার বার বলার চেষ্টা করছে যে, তুহীন চোর নয়, সে চুরি করতে পারেনা।

কিন্তু ৬ষ্ট শ্রেণীতে পড়ুয়া এই ছোট্র মেয়ের কথা রায়হান কানে তুলবেন না, অথবা ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিবেন।

 ইত্যাদি কারনে সত্য কথা বলার ইচ্ছা থাকলেও তা বলতে পারেনি রুমানা রায়হান।

তুহীনকে অপমান করে সফলতার আরও একটি সিড়ি যেন অতিক্রম করলেন রায়হান সাহেব। কারন,ভবিষ্যতে তুহীন যত বড় শিক্ষিত আর নেতাই হোক না কেন, কেউ কোন দিন বলতে পারবেনা,’তুহীনের চরিত্র ফুলের মত পবিত্র।

 কারনে,যে সমাজ তাকে চোরসাববস্ত করে কালীলেপন করে দিয়েছে, সে সমাজ তো তার পিছু পিছুই থাকবে।

                              (চলবে)

                    চলবে।

অভাবের গল্প -১ নেকবর খান

লেখকঃ ফেইসবুক https://www.facebook.com/nekbar.khan.161